জয় রাম
ঃস্বর্গীয় ডঃ প্রভাতচন্দ্র চক্রবর্ত্তীর প্রথম ঠাকুর--দর্শনলাভ ও কিছু লীলা-- কথা (স্মৃতিতে রামঠাকুর)ঃ-
১৯১৮ সন।সেই সময় স্বর্গত প্রভাতচন্দ্র চক্রবর্ত্তী মহাশয় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নব গঠিত সংস্কৃতের স্নাতকোত্তর বিভাগে অধ্যাপকরুপে যোগদান করেন।তারই কয়েকমাস পরের ঘটনা।প্রভাতচন্দ্র তখন বহুবাজার অঞ্চলে মলঙ্গা লেনে একটি বাসাবাটিতে বাস করতেন।
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সময় বাড়ির চিঠির বাক্সে চিঠি দেখে ডালাটি খুললেন।পোস্টকার্ডের পত্র,পত্রের যে পৃষ্ঠায় লেখা তারই দিকে তার চোখ পড়ল,দৃষ্টি আর ফেরাতে পারলেন না।পত্রের পাঠ অনেকটা এই রকমঃআমি নিশ্চিত জানি রাম সাক্ষাৎ ভগবান।আমার ৮০ বছরের উপর বয়স হইয়াছে,সুতরাং আর কতদিন বাঁচিব তাহা জানি না।আমি শুনিয়াছি যে,রাম এখন কলিকাতারই কোনও স্থানে অবস্থান করিতেছেন।মৃত্যুর পূর্বে যাহাতে সাক্ষাৎ নারায়ণ রামের দর্শন পাই তাহার একটু ব্যবস্থা তুমি করিয়া দিবে।এই জন্যই তোমাকে এই পত্র লেখা,যাহাতে তোমার জানা থাকিলে রামের ঠিকানা অতি অবশ্যই শীঘ্র আমাকে জানাইবে।--ইতি যোগজীবন মুখোপাধ্যায়।
পোস্টকার্ডখানি উল্টাইয়া প্রভাতচন্দ্র দেখিলেন যে,পত্রটি পাশের বাড়ির তাহার পরিচিত জনৈক ভদ্রলোককে লেখা।ভুলক্রমে ডাকপিয়ন ওবাড়ির চিঠিখানা তাদের চিঠির বাক্সে ফেলে গেছে।প্রভাতচন্দ্র পাশের বাড়িতে গিয়ে ঐ ভদ্রলোককে ডাকলেন। ভাগ্যক্রমে ভদ্রলোক বাড়িতেই ছিলেন।প্রভাতচন্দ্র তাকে ঘটনাটি খুলে বললেন এবং তাকে না জানিয়ে ঐ পত্র পড়ার জন্য বার বার ক্ষমা ভিক্ষা করলেন।পত্রে লিখিত রামের ঠিকানা তার জানা থাকলে বলবার জন্যও অনুরোধ করলেন।ভদ্রলোক সহাস্যে ঠিকানাটি প্রভাতচন্দ্রকে জানালেন।
বহুবাজার স্ট্রীট ধরে প্রভাতচন্দ্র পায়ে হেঁটে চলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।আর ভাবছেন এই রামের নাম তো তিনি কোনদিনও শোনেননি অথচ পত্রলেখক লিখেছেন রাম সাক্ষাৎ ভগবান।পত্রলেখকের বয়স অশীতিপর,সুতরাং তার অভিজ্ঞতা উপেক্ষণীয় নয়।অধিকন্তু পত্র রচয়ীতা সেই সময়ের সুপ্রসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থ "ধর্মসার সংগ্রহের" রচয়িতাও বটেন।সুতরাং প্রচুর পাণ্ডিত্যের অধিকারী তিনি এবং ধর্ম কী তাহা নিয়েও বহু আলোচনা তিনি করেছেন।এহেন ব্যক্তি যখন নিঃসংশয়ে উপলব্ধি করেছেন যে,রাম সাক্ষাৎ ভগবান তখন আর কালবিলম্ব নয়।ঐ ঠিকানায় একবার গিয়ে চেষ্টা করে দেখতে হবে ভগবদ দর্শন ভাগ্যে আছে কী?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস সেদিন প্রভাতচন্দ্রের দু'টোতেই শেষ হয়ে গেল।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তিনি ঠিকানাটি লক্ষ্য রেখে দ্রুতপায়ে এগিয়ে চললেন।একে ওকে জিজ্ঞাসা করতে করতে প্রায় পৌনে তিনটা নাগাদ ঠিক ঠিকানায় এসে পৌঁছলেন।দু'টি যুবক গলির সামনে দাঁড়িয়েছিল,প্রভাতচন্দ্রের মুশকিল হলো যে শুধু রাম নামই তার জানা ছিল কিন্তু পুরো নামটি তাড়াতাড়িতে পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়নি।সেজন্য তিনি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও ঢুকতে ইতস্ততঃ করছিলেন।যুবক দু'টি তার অবস্থা দেখে এগিয়ে এলেন।প্রভাতচন্দ্র তাদের পত্রের সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন।যুবক দু'টি তাকে অপেক্ষা করতে বলে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলেন।ক্ষণপরে তারা ফিরে এলেন এবং বললেন--আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন।বলেই দোতলায় উঠে একটি মহিলার সঙ্গে চুপিচুপি কিছু কথা বলে প্রভাতচন্দ্রকে একটি দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, "ইনিই সেই।"
একখানা অতি সাধারণ তক্তপোষের উপর সামান্য বিছানা পাতা।তার উপর সোজা হয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ।পরনে তাঁর আধময়লা একখানা ধূতি,বক্ষ বেষ্টন করে রয়েছে মলিন উপবীত।তাঁর কন্ঠলগ্ন হয়ে রয়েছে তিন গাছা তুলসীর মালা।দুই কর্ণমূলে অতি সামান্য স্বর্ণচিহ্ন।ক্ষৌরকর্ম বোধ করি দিন দশেকের মধ্যে হয় নাই।প্রশস্ত ললাটের নিচে নয়ন দু'টি বড়ই উজ্জ্বল,দৃষ্টি অতি মধুময়।আজানুলম্বিত বাহু প্রসারিত করে তিনি বললেন, "আসেন,আসেন,বসেন।" প্রভাতচন্দ্র ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন।তার চেয়ে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন বৃদ্ধটি।সুতরাং প্রণাম করতে তো কোন আপত্তি নেই।প্রভাতচন্দ্র প্রণামের ইচ্ছা প্রকাশ করতে চারুচরণ দু'খানি তিনি প্রসারিত করে দিলেন।প্রণাম সেরে প্রভাতচন্দ্র মেঝেতে বসলেন,বাধা দিয়ে তিনি বললেন যে,এই বিছানায় স্থান আছে,তিনি এখানে এসে বসুন।উত্তরে প্রভাতচন্দ্র জানালেন যে গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে সিমেন্টের শীতল মেঝেতে বসা অনেক সুখকর।বলেই প্রভাতচন্দ্র তার গলাবন্ধ কোটটি খুললেন। "ফতুয়াটাও খুইল্যা ফেলেন,ওটা তো ভিজা", বললেন বৃদ্ধটি।প্রভাতচন্দ্র তখন আটাশ বছরের যুবক।সম্পূর্ণ অপরিচিতের গৃহে উর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে তার দ্বিধা ছিল।ঠাকুরমহাশয় খাট থেকে নিচে নামলেন,বাধ্য করলেন প্রভাতচন্দ্রকে ফতুয়া খুলে রাখতে।পাশের ঘর থেকে একটি হাতপাখা হাতে করে ফিরে এলেন।ফিরে এসে গ্রীষ্মে-কাতর প্রভাতচন্দ্রকে বাতাস করতে লাগলেন।বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত উঠে দাঁড়ালেন প্রভাতচন্দ্র এবং ঠাকুরমহাশয়ের হাত একরকম ছিনিয়ে পাখাটি টেনে নিলেন।বললেন যে,তিনি কে তা তিনি জানেন না,বোঝেননি।তবে এটা তো ঠিক যে তিনি তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়,সুতরাং বয়োজ্যেষ্ঠ পরিশ্রম করে হাওয়া করবেন আর বয়সে কনিষ্ঠ অম্লানমুখে সেই হাওয়া খাবেন,এটা অতি অন্যায়।এ কখনই হতে পারে না।একটু সুমধুর হাসি হেসে ঠাকুরমহাশয় বললেন, " শিশুকালে পিতা-মাতার সেবায় কি আপনে বাধা দিতে পারছেন?" উত্তরে প্রভাতচন্দ্র জানালেন "বাবা-মা তো আপনজন,তারা শিশুকালে অনেক কিছুই করেছেন,কিন্তু পরে কি তাদের থেকে সেবা নেওয়া যায়?" ঠাকুরমহাশয় তখন বললেন, "বাবা-মা আপনের আপনজন,আমি কি পর?" চমকে উঠলেন প্রভাতচন্দ্র,এমন কথা তো ইতিপূর্বে কারও কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হতে শোনেননি।কয়েক মিনিটের মধ্যেই এমন আপন করে নিতেও আর কাউকে দেখেননি।শ্রীরামচন্দ্রের চরণে আকুল হয়ে পুনরায় প্রণাম করলেন প্রভাতচন্দ্র।

.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: