জয় রাম
শ্রীশ্রী ঠাকুর রামচন্দ্র-"মায়েরা নাম নিবেন না?"
সহসা ঠাকুরমহাশয়ের কন্ঠ থেকে সস্নেহে উচ্চারিত হল। "নাম" কী তার সঙ্গে অণুমাত্র পরিচয় এই রমণীদের ছিল না।অনেক মধুময় ডাক তারা শুনেছেন।কিন্তু "মা" বলে তাদের ডাকা,এই তাদের কানে প্রথম আর তাও শুনলেন ঠাকুরমহাশয়ের কন্ঠ থেকে।অকুল সমুদ্র আকুলতাকে রুখতে পারে কিন্তু এই রমণীরা ঠাকুরমহাশয়ের কন্ঠে উচ্চারিত "মা"-- ডাকে যেন সপ্ত সমুদ্রের কলধ্বনি শুনতে পেলেন; শিরায় শিরায়,উপশিরায় উপশিরায়,ধমনীতে ধমনীতে নতুন রক্তের স্বাদ তারা অনুভব করলেন।জঘন্যতার সঙ্গে,অরণ্য বর্ব্বরতার সঙ্গে তাহাদের প্রতিদিনের পরিচিতি।কিন্তু " মা" বলে তাদের বরণ করে নেওয়া এ যে চরম এবং পরম প্রাপ্তি।আবার শ্রাবণের ধারা নামল সকলের চোখে।ঠাকুরমহাশয় একে একে সকলকে নাম দিতে লাগলেন।কীভাবে নাম করতে হবে তাও পৌনঃপুনিক বলে দিলেন।পরে নামের মাহাত্ম্যও বললেন অনেকক্ষন ধরে।
ঠাকুরমহাশয়ের কথা শেষ হলে রমণীরা চোখের জল মুছে তাঁহার শীতল চরণ দু'খানিতে প্রণাম করলেন পুনর্বার।তারা বুঝলেন,জীবনের সমস্ত জ্বালা আজ যেন দূর হয়ে গেল।বর্ষীয়সী এবং অন্য রমণীরা বলে সমস্বরে বলে উঠলেন, "বাবা,এবার তবে আমরা আসি।" --"আসেন গিয়া মায়েরা," অনুমতি দিলেন ঠাকুরমহাশয়।
এরা যখন এসেছিল,ভয় ছিল তাদের অন্তর জুড়ে,শঙ্কায় চরণ চলছিল না।নয়নে ছিল ভীরু দৃষ্টি আর ছিল কন্ঠ-ভরা কুন্ঠা।বারাঙ্গনারা যখন ঠাকুরবাড়ির অঙ্গন অতিক্রম করছেন তখন তাদের পদক্ষেপ ছিল দৃপ্ত,কন্ঠে বিজয়িনীর উল্লাস আর অন্তরে ছিল অশেষ আশা এবং পরম প্রাপ্তির পরা-তৃপ্তি।একদল রাজহংসীর মত কলকন্ঠে গ্রাম্য পথ মুখরিত করে চলতে লাগলেন তারা।
এতক্ষন পর্য্যন্ত মনোমোহন মালাকার স্তব্ধ হয়ে ঘরের এক পাশেই বসেছিলেন। ক্ষণকাল পরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন,ঠাকুরমহাশয়ের কাছে গিয়ে প্রণাম করে বললেন, "ঠাকুরমহাশয়,আমাকে কি নাম দিবেন?" "হঃ, এই ন্যান।" দাতা উদ্যত,কিন্তু যিনি নাম ভিক্ষা করলেন তিনি পশ্চাৎপদ। মালাকার বললেন,তিনি স্নান করেননি,বাসি কাপড়ও ছাড়েননি,এই অবস্থায় নাম নেন কী করে?তার অসুবিধার কথাটা ব্যক্ত করায় ঠাকুরমহাশয় বললেন,"নাম সর্ব্ব অবস্থায় পবিত্র,সেখানে শুচি-অশুচি নাই,দিনক্ষণ নাই।যখন নেন,যতটা নেন,ততই মঙ্গল।" অনেকক্ষন ধরে ঠাকুরমহাশয় নামের কথা মালাকারকে বললেন। কিন্তু বহু জন্ম-জন্মান্তরীণ সংস্কারের জগদ্দল পাষাণ-স্তুপ তাহাতেও সূচাগ্র ভূমি নড়লো না।মালাকার জানতে চাইলেন যে ঠাকুরমহাশয় সেখানে আগামীকাল পর্য্যন্ত থাকবেন কিনা।তাহলে তিনি আগামীকাল সকালে স্নান করে এসে নাম নেবেন।উত্তরে ঠাকুরমহাশয় বললেন,, "হ,আমি থাকুম।আপনার যখন ইচ্ছা,কালই নিতে পারেন।"
বাড়ির মুখে কয়েক পা মাত্র অগ্রসর হয়েছিলেন মালাকার।সহসা ফিরে এসে আবার ঠাকুরমহাশয়ের কাছে নাম ভিক্ষা করলেন--ঠাকুরমহাশয়ও নাম দিলেন।নামের অনেক কথা ঠাকুরমহাশয়ের মুখ থেকে তিনি শুনলেন।তখন মালাকারের মনে হচ্ছিল তিনি যেন স্নান শেষে,ধৌত বাসে,ঠাকুরমহাশয়ের কাছে বসে আছেন।এমন স্নিগ্ধ ও পবিত্র ভাব এরপর শ্রীমনোমোহন মালাকার তার নব্বই বছরের দীর্ঘ জীবনে আর কোনদিনও অনুভব করেন নি।
জয় গোবিন্দ।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: