স্বর্গীয় বীরেন বাবুর বিবাহঃ-
অনুঢ়া কন্যাকে নিয়ে ভদ্রলোক বড়ই বিপন্ন।
ভদ্রলোক কন্যাটিকে পাত্রস্থ করার চেষ্টা করছেন,চেষ্টা করলেও কোন সম্বন্ধ স্থিরীকৃত হয়ে উঠছে না।এর জন্য সংসারে তার শান্তি নেই, লেগে আছে লাঞ্চনা আর গঞ্জনা, অথচ কন্যাটি বয়সে তখনও বালিকামাত্র।স্বর্গীয় কুঞ্জকুমার বসুর আত্মীয়রা মাঝে মাঝে কন্যার বিবাহের প্রসঙ্গ তুলে কাটা ঘায়ে নুন ছিটিয়ে দেয়।সে জ্বালাও কম নয়। মাঝে মাঝেই তাদের আগমন হয় এবং অব্যক্ত ব্যথা দিনের পর দিন সহ্য করা ভিন্ন আর কোন পথ তিনি খুঁজে পান না।তথাকথিত এই সকল শুভানুধ্যায়ীরা যখনই তার গৃহে প্রবেশ করেন তখনই দৌর্বল্য তার চিত্তকে ঘিরে রাখে। আবার আক্রমণ তারা তো করবেনই,এ তাদের স্বভাব। দৃঢ় হয়ে তাই নির্বিচারে মুখ বুজে সব সহ্য করেন।
অথচ ভদ্রলোক যে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে আছেন তা মোটেই নয়।পাত্রের খোঁজ খবরের জন্য তিনি পরিশ্রম করেন প্রচুর কিন্তু তার সব পরিশ্রমই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। দুশ্চিন্তায় মাঝে মাঝে অর্ধরাত্রে তার ঘুম ভেঙ্গে যায় আর ঘুমাতে পারেন না।সংসারে,সমাজে তিনি যে সম্পূর্ণ অক্ষম ও অপদার্থ এই পরিচিতি নিয়েই কী তাকে দিন কাটাতে হবে?কন্যাটি তার সুলক্ষণা,দেখতেও এতদিন তো সকলেই ভালো বলেছে। বহুর প্রশংসাও সে পেয়েছে। তিনি নিজে খুলনার একজন জমিদার,অর্থব্যয় করতেও তিনি অপারগ নন।তবে কেন হচ্ছে না? ত্রুটি কোথায়? এই নিদারুণ দুশ্চিন্তা নিয়ে নিরুপায় হয়েই অবিবাহিত কন্যাটিকে রেখে কী তার শেষ নিঃশ্বাস পড়বে। শুভশঙখ কবে বেজে উঠবে?
স্বর্গীয় কুঞ্জকুমার বসু ঠাকুরমহাশয়ের আশ্রিত অনেক বছর ধরে। তাহার সান্নিধ্য তিনি অনেক সময় কাটান।কিন্তু কন্যার বিবাহ,পুত্রের পরীক্ষা অথবা সংসারে অসুখ-বিসুখের কথা তিনি কোনদিনই ঠাকুরমহাশয়কে বলেন নি।সত্যরত্নের জন্য যাঁহার সমীপে যাওয়া তাঁহাকেও কি সংসারের সামান্য দুঃখ-কষ্টের কথা জানিয়ে বিব্রত করা উচিত? অসমূর্দ্ধ ঠাকুরমহাশয়কে তার দুঃখভোগ দূরীকরণের জন্য সংসারের পাকচক্রে টেনে আনতে তিনি নারাজ।
ক্রমশঃ বেদনার ভাত এত দুঃসহ হলো যে তিনি মনের দৃঢ়তা আর ধরে রাখতে পারলেন না।ঠাকুরমহাশয়কে সেদিন একলা পেয়ে ভদ্রলোক তার এই কন্যা নিয়ে বিড়ম্বনার কথা অকপটে জানালেন। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরমহাশয় বললেন, "বীরেনবাবু তো ভাল ছেলে। ওনার সঙ্গে বিবাহ দেন।" বীরেন রায় ঐ ভদ্রলোকের পূর্ব পরিচিত। উনি যে সৎপাত্র তা ভদ্রলোক বিলক্ষণই জানেন। তিনি যখন ঠাকুরমহাশয়ের কাছে আসেন তখন বীরেন রায়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণ আগে উঠে গিয়েছেন অন্য ঘরে।,ঐ গৃহ স্বামীর সঙ্গে তখন তিনি কথাবার্তা বলছিলেন।
নিতান্ত পরিচিতের মধ্যে বলেই ভদ্রলোক সরাসরি বীরেন রায়ের কাছে তার কন্যার পাণিগ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করতে দ্বিধাগ্রস্থ হয়েছিলেন। পরে তিনি ঠাকুরমহাশয়ের অন্য আশ্রিতকে দিয়ে বিবাহের প্রস্তাব তোলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একথাও তারা বীরেন রায়কে জানিয়ে দিলেন যে এ বিবাহ ঠাকুরমহাশয়ের অভিপ্রেত।
অনেকের মুখ থেকে একই বিবাহের প্রস্তাব বীরেন রায় শুনলেন এবং সকলকেই একই উত্তর দিলেন যে তিনি বিবাহ করতে সম্পূর্ণরুপে অনিচ্ছুক। কন্যার পিতা তারও পরিচিত এবং অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ।তাই বীরেন রায়,যারা তার নাম উত্থাপন করেছিলেন,তাদের প্রত্যেককেই অসম্মতি জানাবার সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলে দিয়েছেন যে তিনি যেন তার উপর নির্ভর করে না থেকে অন্যত্র চেষ্টা করেন।
অনেক আশায় বুক বেঁধে কুঞ্জবাবু ঠাকুরমহাশয়ের কয়েকজন আশ্রিতকে বীরেন রায়ের কাছে বিবাহের প্রস্তাব তুলতে অনুরোধ করেছিলেন। তাদের সকলেই যখন একে একে বীরেনবাবুর অসম্মতির কথা তাকে জানিয়ে গেলেন তখন হতাশায় ভরে উঠল তার মন।
দীর্ঘ কয়েক মাস পরের কথা।ঠাকুরমহাশয় কলকাতায় পুনরায় আগমন করলে ঐ ভদ্রলোক তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বীরেন রায়ের বিবাহে অসম্মতির কথা জানালেন। ক্ষণকাল নীরবতার পর ঠাকুরমহাশয় বললেন, "ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সকলেই তো বিবাহ করেছেন, বীরেনবাবু করবেন না ক্যান?" ঘরে উপস্থিত সকলেই নীরব। বীরেন বাবু কেন বিয়ে করতে রাজি নন সে কথা খুলে কাহাকেও বলেননি।সেই সময়ে তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিত থাকলেও স্বভাব-লাজুক বীরেনবাবু ঠাকুরমহাশয়ের সামনে নিজের বিবাহের কথা আলোচনা করতে পারতেন না। ঠাকুরমহাশয় কুঞ্জবাবুকে অভয় দিয়ে বললেন, "আপনি চিন্তা করবেন না, বীরেন রায়ের সঙ্গেই বীণাদেবীর বিবাহ স্থির "।
একটি বছর পূর্ণ হলো।বীরেনবাবুর সেই "না" আর "হ্যা" হলো না এই দীর্ঘকালের মধ্যেও।যুগান্তে মেরু উল্টায়,কল্পান্তে উল্টায় সাগর,কিন্তু বীরেনবাবুর "না"-এর জগদ্দল সূচ্যগ্র ফাঁক হলো না "হ্যাঁ" বলার জন্য। ঠাকুরমহাশয়ের আদেশ অমান্য করবার জন্য সে সময়ে তাঁহার আশ্রিত এবং বীরেনবাবুর শ্রদ্ধাস্পদ এমন কয়েকজন যারা সত্যই বীরেনবাবুকে স্নেহ করতেন এবং ভালবাসতেন তারা বীরেনবাবুর প্রতি বিরুপ হয়েছিলেন।
বীরেনবাবু ঠাকুরমহাশয়ের আদেশ পালনে অসমর্থ হয়েছিলেন সত্য,কিন্তু কলকাতায় ঠাকুরমহাশয় যে গৃহেই থাকুন না কেন প্রতিদিন অন্ততঃ একবার বীরেনবাবু সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেন।ঠাকুরমহাশয়ও কোনদিন এ বিষয়ে কোন কথা তাকে বলেননি। আর বীরেনবাবুও কোনদিন তার অক্ষমতা মার্জনা করার জন্য তাঁহাকে অনুরোধ করেননি।
পূর্বে সম্বন্ধের জন্য কুঞ্জবাবু মাঝে মাঝে ছুটাছুটি করতেন। ঠাকুরমহাশয়ের ঐ আশ্বাসবাণী পাবার পর তিনিও আর অন্যত্র চেষ্টা করেননি। কন্যাটির বয়স বাড়ছে,বৃদ্ধি পাচ্ছে আত্মীয়-স্বজনদের গঞ্জনা। কিন্তু কুঞ্জবাবু স্থির হয়েই আছেন,যদিও তিনি একান্ত ভাবেই নিরুপায়।
ঘূর্ণ্যমান এই পৃথিবী,কালপূর্ণ হলেই সব ঘটে।কালে বীরেন বাবুরই মানসিক পরিবর্তন ঘটল।ঠাকুরমহাশয়ের এ আদেশ এত দীর্ঘকাল ধরে অমান্য করে আসার জন্য অন্তরে মর্মবেদনা অনুভব করছিলেন। তাই যারা একদিন তার কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি যাদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আজ ক'দিন ধরে বীরেনবাবু তাদেরই দ্বারে দ্বারে এবং তার সম্মতি জানিয়ে এলেন। ইতিপূর্বে তাদের অনুরোধ যে তিনি রক্ষা করতে পারেননি সেজন্য মার্জনাভিক্ষাও করে এলেন তাদের কাছে।
ঠাকুরমহাশয় তখন কলকাতায় ছিলেন না,ছিলেন নৈনিতালে।সেখানে পত্র লেখা হলো,জানান হলো বীরেনবাবু ঐ কন্যার পাণিগ্রহণে প্রস্তুত। ঠাকুরমহাশয় বীরেন রায়ের সব অপরাধ ক্ষমা করে যদি শুভ দিনটি স্থির করে দেন তাহলে ঐ শুভ কাজটি শীঘ্রই সম্পন্ন হতে পারে।ঠাকুরমহাশয় শুভ বিবাহের দিন স্থির করে স্বর্গীয় ডক্টর প্রভাতচন্দ্র চক্রবর্তীকে একখানি পত্র দেন এবং তাকে আদেশ করেন তিনি যেন নিজে উপস্থিত থেকে বীরেন রায় এবং বীণাদেবীর শুভ পরিণয় সম্পন্ন করান।
বীরেনবাবু তখন থাকতেন পদ্মপুকুর রোডের একটি বাসা বাড়িতে। তার বিয়ের কয়েক মাস পরে ঠাকুরমহাশয় একদিন সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।বাজারে যাবার সময় তিনি বীরেনবাবুকে বলে দিতেন কী কী তরকারি আনতে হবে।একদিন ঠাকুরমহাশয়ের নির্দেশমত একটি মোচা বীরেনবাবু এনেছিলেন। সদ্য পরিণীতা বীরেনবাবুর সহধর্মিণী মোচা কাটায় ও রন্ধনে তেমন নৈপুণ্য অর্জন করতে পারেন নি।ঠাকুরমহাশয় স্বহস্তে ঐ মোচাটি কাটলেন,রান্না ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রন্ধন পদ্ধতি বীণাদেবীকে বলে দিতে লাগলেন।শুধু মোচাই নয়,বীরেনবাবু যে সমস্ত শাক-সবজি,তরি-তরকারি পছন্দ করতেন,বীরেনবাবুকে বলতেন সেগুলি আনতে,কেটে দিতেন নিজ হাতে আর রন্ধন পদ্ধতি বলে দিতেন বীণাদেবীকে।অফিস থেকে ফিরে বীরেনবাবু কী দিয়ে জলযোগ করবেন তা নিয়ে অপরাহ্ন থেকেই ব্যতিব্যস্ত থাকতেন ঠাকুরমহাশয় আর ব্যস্ত করে রাখতেন বীণাদেবীকে।তাদের আহারাদির ব্যাপারে ঠাকুরমহাশয়ের যে এত আগ্রহ এবং প্রতিদিন যে তিনি এত কষ্ট করছেন তা বীরেনবাবু কিছু কিছু দেখেছেন। বাকিটুকু শুনতেন তার সহধর্মিণীর কাছ থেকে।
মনে মনে বীরেনবাবু ভাবতেন শুধু পারত্রিক নয়,ঐহিকেরও এমন বান্ধব যিনি, তাঁহার আদেশ তিনি এতদিন লঙ্ঘন করে এসেছেন অথচ ঠাকুরমহাশয় তার জন্য তার উপর অণুমাত্র বিরুপ হন নাই।জননী সন্তানের আহারের উপর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি সর্বক্ষণ রাখেন এবং ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করেন।এই একমাসের ওপর ঠাকুরমহাশয় তাদের সংসারে আছেন, প্রতিদিন তাদের ওপর ঠাকুরমহাশয় যে দৃষ্টি রেখেছেন তাতে বার বার জননীর কথাই মনে পড়ে।
নিজে অপরাধী। কাজেই ঠাকুরমহাশয়কে এ বিষয়ে কোন কথা বলতে বীরেনবাবু বড় সঙ্কোচবোধ করছিলেন। আজ আর সামলাতে পারলেন না।ঠাকুরমহাশয়ের চরণ দু'টি ধরে সাশ্রুনয়নে স্বীয় অপরাধ স্বীকার করলেন বীরেন রায়। আর ক্ষমা ভিক্ষা করলেন অহেতুক তাঁহার আদেশ পালনে বিলম্ব ঘটানোর জন্য। সস্নেহে ঠাকুরমহাশয় সহধর্মিণীসহ বীরেনবাবুকে বললেন যে অপরাধ কোন কিছু তিনি করেননি। যে সময়ে বিবাহ নির্দিষ্ট তার একদিন আগে বা একদিন পরে হতে পারে না।কাল পূর্ণ না হলে কোন কিছু ঘটে না। টেনে বড় করা যায় না বা কাঁচা কাঠাল কিলিয়ে পাকান যায় না। যে ক্ষণে যা কিছু ঘটবার তা পূর্বনির্দিষ্ট হয়েই আছে।সুতরাং বীরেনবাবু কেন দুঃখ করছেন। এতদিনের পুঞ্জীভূত মনের মেঘভার লঘু হয়ে গেল। চোখ মুছে সহধর্মিণীসহ বীরেনবাবু ঠাকুরমহাশয়ের চরণে প্রণাম করলেন। খাটের একপাশে রাখা চাদরখানা বাঁ হাত দিয়ে টেনে নিলেন ঠাকুরমহাশয়। গায়ে জড়িয়ে নিয়ে তিনি বললেন এবার তাহলে আমি আসি।
জয় রাম। জয় গোবিন্দ।


Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel) on ডিসেম্বর ২৪, ২০২৪ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.